F-7BG1 যুদ্ধবিমান নিয়ে সাদরুলের স্পষ্ট বার্তা

প্রকাশিত: ১০:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২৫

সাদরুল আহমেদ খান:

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধবিমানটি নাকি ৫০-৬০ বছর পুরনো,পাইলট দায়িত্বহীন ছিলেন,এমন মনগড়া সমালোচনায় ভরে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন সাবেক স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে আমার দায়িত্ববোধ থেকেই কিছু পরিষ্কার কথা বলা জরুরি মনে করছি।

যুদ্ধবিমান F-7 নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে জানতে হবে এটি একটি একক মডেলের নাম নয়,বরং বিভিন্ন আপগ্রেডেড ভার্সনের সমষ্টি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ১৯৮০’র দশকে F-7M দিয়ে শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে উন্নততর F-7MB, F-7BG এবং সর্বশেষ F-7BG1।

 

এই F-7BG1 ভার্সনই ছিল সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার বিমান,যেটি ২০১৩ সালে বহরে যুক্ত হয়েছে। এর ডিজাইন ও প্রযুক্তি পুরোনো হলেও ইঞ্জিন, নেভিগেশন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও এভিওনিক্স সিস্টেম অত্যাধুনিক। এটিকে চোখ বন্ধ করে “৬০ বছরের পুরনো” বলাটা প্রযুক্তিগত ও পেশাগতভাবে ভুল।

 

সোজা করে বললে,”iPhone পুরোনো,অথচ আপনার iPhone ১৫ প্রো ম্যাক্স। তাহলে বলা যায়,ফোনের আসল বয়স সেটা নয়। একইভাবে F-7BG1 ভার্সনটি মাত্র এক দশকের পুরোনো,তাই এটিকে পুরোনো বলাটা সঠিক নয়।”

 

যেসব কল্পকাহিনি ছড়ানো হচ্ছে,তাতে অনেকেই বলে ফেলছেন “পাইলট ইজেক্ট করেননি,নিশ্চয়ই ভুল করেছিলেন”। কিন্তু বাস্তবতা হলো,একটি যুদ্ধবিমানের গতি সেকেন্ডে প্রায় এক কিলোমিটার। ত্রুটিগ্রস্ত বিমান সামাল দেওয়া আর ল্যান্ডিংয়ের জায়গা বেছে নেওয়া,তা আবার ঢাকা শহরের আকাশে,এটা কয়েক সেকেন্ডের ভেতর অসম্ভব চাপের এক সিদ্ধান্ত।

 

যুদ্ধবিমানটি উত্তর এলাকার জনবহুল এলাকায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে পাইলট তাঁর নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে,চেষ্টা করেছেন স্কুল মাঠ বা খোলা জায়গায় নামাতে। হয়তো সময়মতো ইজেক্ট করার সুযোগ ছিল না। যেটুকু আমরা জানি,সেটুকু থেকেই বোঝা যায় যে,তিনি দায়িত্বশীল ছিলেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন নন।

সোফায় বসে কেউ কেউ সমালোচনার নামে যেভাবে একজন প্রয়াত পাইলটকে অপমান করছেন,তা কেবল অজ্ঞতাই নয়- নির্মমতাও।

 

সশস্ত্র বাহিনীর পাইলটরা শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত নন, বরং প্রতিটি উড্ডয়নেই তারা দায়িত্ব ও ঝুঁকি একসঙ্গে বইয়ে নেন। ভুল হলে বিশ্লেষণ হোক তদন্তের পর,কিন্তু এক তরফা অপপ্রচার একজন সাহসী মানুষের আত্মত্যাগকে অসম্মানিত করে।

 

F-7BG1 যুদ্ধবিমান হয়তো আধুনিক বিশ্বের তুলনায় সীমিত সক্ষমতা সম্পন্ন,তবে একে ছুঁড়ে ফেলার মতো পুরনো নয়। বরং আমাদের কিছু মানসিকতা “পুরনো মানেই খারাপ”,কিংবা “যা জানি না সেটাই ভুল”- এই ধারণাগুলোই আমাদের এগোতে দেয় না।

 

আকাশে উড়তে থাকা প্রতিটি বিমান শুধু প্রযুক্তি নয়,একজন মানুষের সাহস,শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগেরও প্রতীক। সেটা ভুলে গেলে,আমরা কেবল যুদ্ধবিমান নয়,নিজের বিবেকের কাছেই হেরে যাই।

সিলেট প্রতিদিন/এসডি.