৮ বছর পর উদঘাটন:রাউজানের ক্লুলেস খুনের রহস্য

প্রকাশিত: ১২:২২ অপরাহ্ণ, মে ৮, ২০২৫

নিউজ ডেস্ক:

চট্টগ্রামের রাউজানে আট বছর আগে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য অবশেষে উদঘাটন করেছে সিআইডি। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি নির্ভর তদন্ত শেষে নিহতের স্ত্রী, ভাই এবং এক সিএনজি চালককে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতারকৃতরা হলেন; নাছিমা আক্তার (৪২), জসিম উদ্দিন (৫২), ও আবুল কালাম (৪৭)। নিহত ব্যক্তি হলেন প্রবাসফেরত নাজিম উদ্দিন (৫৪)।

 

২০১৬ সালের শেষ দিকে ছেলের নিখোঁজের খবর শুনে কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ দেশে ফিরেছিলেন নাজিম উদ্দিন। ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে জানতে চান ছেলের কথা। সেখান থেকেই শুরু হয় দাম্পত্য দ্বন্দ্ব। প্রায়শই ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল সংসার।

 

২০১৭ সালের মে মাসের এক দুপুরে ঋণ ও বাজার খরচ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে নাজিম উদ্দিন তার স্ত্রীকে চড় মারলে, উত্তেজিত নাছিমা তাকে সজোরে ধাক্কা দেন। দরজার লোহার চৌকাঠে মাথা আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন নাজিম। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকলেও নাছিমা কোনো সাহায্য না নিয়ে সাড়া-শব্দ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, তিনি মারা গেছেন।

 

স্ত্রী তখন মরদেহ গোপনে ঘরের এক কোণে কম্বল ও তোষক দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। প্রমাণ নষ্ট করতে পাসপোর্ট, আইডি কার্ড ও অন্যান্য ডকুমেন্ট পুড়িয়ে ফেলেন। মেয়েরা স্কুলে থাকায় পুরো পরিকল্পনা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। সাত দিন ধরে মরদেহ ঘরের স্টোররুমে আতর ও পারফিউম ছড়িয়ে রাখা হয় যেন দুর্গন্ধ না ছড়ায়।

 

এরপর ভাই জসিম উদ্দিন এবং সিএনজি চালক আবুল কালামকে সাথে নিয়ে মৃতদেহ একটি মুরগির খাবারের বস্তায় ভরে পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

 

দুই মাস পর, ১৮ জুলাই ২০১৭ তারিখে স্থানীয়রা একটি দুর্গন্ধযুক্ত বস্তা ভেসে থাকতে দেখে প্রথমে কুকুরের লাশ ভেবে তা পুকুরের ধারে ফেলে দেন। পরে কাক বস্তা ছিঁড়ে ফেলার পর বেরিয়ে আসে মানুষের হাড়। পুলিশ এসে পঁচা-গলা লাশ উদ্ধার করে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেলে ময়নাতদন্তে পাঠায়। পরিচয় না পাওয়ায় দাফন করা হয় মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে।

 

পরে পুলিশ ১৯ জুলাই ২০১৭ সালে অজ্ঞাত পরিচয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে এবং একইদিন নিহতের ভাই জসিম উদ্দিন থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।

 

সিআইডি তদন্তের অংশ হিসেবে নাজিমের স্ত্রী, ভাই ও কন্যার ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়, উদ্ধার হওয়া লাশটি নাজিম উদ্দিনের। কিন্তু হত্যার মোটিভ এবং অভিযুক্তদের পরিচয় অজানা থেকে যায়।

১৭ বছর পর মাতৃভূমিতে ডা. জোবাইদা রহমান

অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সিআইডি ৪ মে ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করে। ৭ মে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, স্ত্রী নাছিমা আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

 

এ ঘটনার পেছনে নিখোঁজ ছেলের রহস্য আজও অজানা। পরিবারের পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছে সিআইডি।

 

এই হত্যাকাণ্ড যেন এক নিঃশব্দ শোকগাঁথা—যেখানে ভালোবাসা, প্রতারণা, ঘৃণা ও সহিংসতা মিশে তৈরি হয়েছিল এক ভয়াবহ পারিবারিক ট্র্যাজেডি। আট বছরের দীর্ঘ নীরবতার পর অবশেষে ন্যায়ের মুখ দেখল এই গোপন মৃত্যু।

সিলেট প্রতিদিন/এসডি.