আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও চিন্ময় প্রভুর মুক্তি না হওয়ার কারণ

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৫

সত্যজিৎ দাস:

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা একটি উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট থেকে জানা যায়,২০১৩ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের ওপরে হামলার ঘটনা ঘটেছে,যার মধ্যে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ। এই ধরনের ঘটনা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়,বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক ভারসাম্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ

কারণসমূহঃ
১) ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা:
বিভিন্ন সময়ে ধর্মকে হাতিয়ার করে সহিংসতা ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কিছু চক্র ধর্মীয় উত্তেজনা উস্কে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়।

২) আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা:
প্রত্যেক ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অপরাধীরা সঠিক শাস্তি না পাওয়ায় নতুন করে এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস পায়।

৩) সম্পত্তি দখল:
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হামলার পেছনে সংখ্যালঘুদের জমি ও সম্পত্তি দখলের অভিপ্রায় কাজ করে। এটি একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সমস্যা।

৪) রাজনৈতিক প্রভাব ও অপব্যবহার:
রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

এর প্রভাব:
১) সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি:
এসব হামলার ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে এবং সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়।

২) অভিবাসনের হার বৃদ্ধি:
নিরাপত্তার অভাবে অনেক সংখ্যালঘু পরিবার দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা দেশের মানবসম্পদ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হ্রাস করে।

৩) আন্তর্জাতিক চাপ:
এসব ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে চাপ আসে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।

সমাধানের পথঃ-
১) আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ:
প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধির উদ্যোগ:
শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিষয়ক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে।

৩) রাজনৈতিক সদিচ্ছা:
সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে এবং দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪) মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা:
মিডিয়াকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

এদিকে,চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মুক্তি না হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। বিশেষ করে,রাষ্ট্রের কিছু কার্যক্রম ও পদক্ষেপকে উদাসীনতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১) বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্ব: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন থাকলেও, অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে ত্বরান্বিত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি, যা উদাসীনতার পরিচায়ক।

২) মানবাধিকার উপেক্ষা: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অনুসারীরা এবং সনাতনী সম্প্রদায় তাঁর মুক্তির দাবি জানালেও, সরকারের পক্ষ থেকে তা নিয়ে সংলাপ বা আলোচনা হয়নি। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে।

৩) সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা: সনাতনী সম্প্রদায়ের একজন ধর্মীয় নেতার প্রতি এমন উদাসীনতা, সংখ্যালঘুদের প্রতি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারহীন মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়। এতে জাতিগত সংহতির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

৪) প্রশাসনিক অগ্রাধিকারহীনতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব সাধারণত আইনি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করা। তবে এই বিষয়ে প্রশাসন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি।

৫) জনমত উপেক্ষা: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন দাবি জানালেও, সরকার তা এড়িয়ে গেছে। এটি সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা কমিয়ে দেয়।

উল্লেখ্য,অন্তর্বর্তী সরকারকে এমন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হয়। কিন্তু এখানে তাদের উদাসীনতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ঘাটতি স্পষ্ট করেছে।

বর্তমানে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাঁর রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আইনজীবী ও অনুসারীরা অভিযোগ করছেন যে, কারাগারে তিনি পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন না।

তাঁর অনুসারীরা মনে করছেন,কারাগারে তাঁর চিকিৎসা এবং জীবনযাপন ব্যবস্থায় অবহেলা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির আশঙ্কায় বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে।

অন্যদিকে,কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, তাঁর জামিনের শুনানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে।

তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা ও মুক্তির বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে,তবে অনুসারীরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছেন।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মুখপাত্র শ্রী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে শুধু কারাগারে নিক্ষেপ নয়। সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার মতো ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অগ্রহণযোগ্য। এটি দেশের শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। তাই এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন মজবুত করতে হলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে।

সিলেট প্রতিদিন/এসডি.